দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে একটি সম্ভাব্য সমাধানের কথা জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি দাবি করেন, স্থানীয় সময় রোববার (২২ মার্চ) গভীর রাত পর্যন্ত মার্কিন দুই শীর্ষ দূতের সঙ্গে ইরানি প্রতিনিধিদের আলোচনা হয়েছে, যেখানে বেশ কিছু প্রধান বিষয়ে উভয় পক্ষ ঐকমত্যে পৌঁছেছে।
এই আলোচনাগুলোকে অত্যন্ত গঠনমূলক ও ফলপ্রসূ হিসেবে উল্লেখ করে ট্রাম্প জানান, মূলত ইরানের পক্ষ থেকেই এই আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল এবং এর সফল বাস্তবায়ন মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘদিনের সংঘাতের একটি স্থায়ী সমাধান বয়ে আনতে পারে।
স্থানীয় সময় সোমবার (২৩ মার্চ) সকালে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের ওয়েস্ট পাম বিচ বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের এ কথা জানান ট্রাম্প।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের কোনো আলোচনা হয়নি বলে দাবি করেছেন ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। এর আগে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতি একই দাবি করে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে গালিবাফ লিখেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি। আর্থিক ও তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যে চোরাবালিতে আটকে গেছে, তা থেকে বাঁচতে মিথ্যা খবর ব্যবহার করা হচ্ছে।’
দ্বিতীয় একটি পোস্টে গালিবাফ লিখেন, ইরান ‘আগ্রাসনকারীদের পূর্ণাঙ্গ ও অনুশোচনামূলক শাস্তি’ দাবি করে। এই লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত ইরানের কর্মকর্তারা ‘দৃঢ়ভাবে তাঁদের সর্বোচ্চ নেতা ও জনগণের পাশে রয়েছেন।’
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দেওয়া তথ্যমতে, দুই দেশ মোট ১৫টি পয়েন্ট বা দফার ওপর ভিত্তি করে একটি সমঝোতায় পৌঁছেছে। এই সমঝোতার প্রধান ও প্রথম তিনটি শর্তই হচ্ছে ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র ত্যাগের অঙ্গীকার।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘ইরানের সঙ্গে বেশ কিছু প্রধান বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে। দেখা যাক এই আলোচনা শেষ পর্যন্ত আমাদের কোথায় নিয়ে যায়।’
এই আলোচনার অগ্রগতির প্রেক্ষিতে ট্রাম্প ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং জ্বালানি অবকাঠামোতে পরিকল্পিত সামরিক হামলা ৫ দিনের জন্য স্থগিত করার নির্দেশ দিয়েছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি অত্যন্ত আনন্দের সাথে জানাচ্ছি যে, গত দুই দিনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান মধ্যপ্রাচ্যে আমাদের মধ্যকার শত্রুতার একটি পূর্ণাঙ্গ ও সামগ্রিক সমাধানের বিষয়ে অত্যন্ত ভালো ও ফলপ্রসূ আলোচনা করেছে।’
এই গভীর, বিস্তারিত এবং গঠনমূলক আলোচনার পুরো সপ্তাহজুড়েই চলবে জানিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আমি যুদ্ধ বিভাগকে ইরানের বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর যেকোনো এবং সমস্ত সামরিক হামলা পাঁচ দিনের জন্য স্থগিত রাখার নির্দেশ দিয়েছি।’
আলোচনার প্রক্রিয়া সম্পর্কে প্রেসিডেন্ট আরও জানান, তার বিশেষ প্রতিনিধি স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনার সরাসরি এই আলোচনায় যুক্ত ছিলেন। তবে ইরানের পক্ষ থেকে ঠিক কার সঙ্গে কথা হচ্ছে, সে বিষয়ে তিনি কিছুটা অস্পষ্টতা বজায় রেখেছেন।
ট্রাম্প বলেন, ‘আমি বলব আলোচনাগুলো চমৎকারভাবে সম্পন্ন হয়েছে। ইরান নিজেই এই আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছে। তারা যদি এটি বজায় রাখে, তবে আমি মনে করি এই সমস্যা বা সংঘাতের একটি অত্যন্ত কার্যকর সমাধান হবে।’
তিনি শুধু জানিয়েছেন, তারা ইরানের একজন অত্যন্ত ‘সম্মানিত’ নেতার সঙ্গে কথা বলছেন, তবে তিনি দেশটির বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মুজতবা খামেনি নন। ‘তারা একটি চুক্তি করতে খুব আগ্রহী, আমরাও একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে চাই’— উল্লেখ করে ট্রাম্প জানান, এই আলোচনার ধারাবাহিকতায় সোমবার আরও কিছু ফোনালাপ এবং খুব শিগগিরই উভয় পক্ষের মধ্যে একটি সশরীরে বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
আলোচনার অন্যতম বিষয়ের মধ্যে রয়েছে ইরানের পারমানবিক কর্মসূচি। যদিও ইরান ইতিপূর্বে প্রকাশ্যে পারমাণবিক অস্ত্র না বানানোর কথা বলেছে, তবে এবারের আলোচনায় তারা বিষয়টি নিয়ে সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বলে ট্রাম্প উল্লেখ করেন।
ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরান তাদের কাছে থাকা উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বা ‘পারমাণবিক উপাদান’ যুক্তরাষ্ট্রের জিম্মায় দিয়ে দিতে সম্মত হয়েছে, যা এই সম্ভাব্য চুক্তির একটি বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘পারমাণবিক উপাদানগুলো আমরা নিতে চাই এবং আমার মনে হয় আমরা তা পাব। আমরা এ বিষয়ে একমত হয়েছি।’
বর্তমান পরিস্থিতি পর্যালোচনায় ট্রাম্প পাঁচ দিনের একটি সময়সীমা নির্ধারণ করেছেন এবং এই সময়ের মধ্যে আলোচনার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা হবে। যদি সমঝোতা সফল হয় তবে সামরিক পদক্ষেপ বন্ধ হবে, অন্যথায় পুনরায় পূর্ণশক্তিতে বোমাবর্ষণ শুরু করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।
এই সংঘাতের সরাসরি প্রভাব বিশ্ববাজারে পড়ছে উল্লেখ করে ট্রাম্প দাবি করেন, চুক্তি সম্পন্ন হওয়া মাত্রই তেলের আকাশচুম্বী দাম নাটকীয়ভাবে হ্রাস পাবে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির সংকটের কারণে তেলের দামে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তার স্থায়ী সমাধান হবে বলে তিনি আশাবাদী।
তবে আলোচনার টেবিলে আশার আলো দেখা গেলেও ট্রাম্প স্পষ্ট করেছেন এটি কোনো চূড়ান্ত নিশ্চয়তা বা গ্যারান্টি নয়। তিনি আলোচনার সমান্তরালে ইরানে একটি ‘গুরুতর কাঠামোগত পরিবর্তন’ বা রেজিম চেঞ্জের আকাঙ্ক্ষাও ব্যক্ত করেছেন।
ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ‘একটি চুক্তির খুব জোরালো সম্ভাবনা আছে; তবে এটি কোনো কিছুর গ্যারান্টি দেয় না; আমি কোনো কিছুর নিশ্চয়তা দিচ্ছি না।’
সব মিলিয়ে, ট্রাম্পের এই বক্তব্যে একদিকে যেমন যুদ্ধের সমাপ্তি ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সম্ভাবনা ফুটে উঠেছে, অন্যদিকে ইরানের শাসনব্যবস্থা নিয়ে তার কঠোর অবস্থান ভবিষ্যতের আলোচনাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
এবি/